দৌলতদিয়া পতিতাপল্লীর যৌনকর্মীদের দিনকাল

আবুল হোসেন
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ১০:০০ AM, ২০ জুলাই ২০২০

রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া পতিতাপল্লী দেশের সর্ববৃহৎ পতিতাপল্লী। করোনার প্রাদুর্ভাবের পূর্বে যারা আরাম-আয়েশে দিন কাটিয়েছে, এখন তাদের দুর্দিন চলছে।

রূপবতী চেহারার যে যৌনকর্মীরা খরিদ্দারদের নজর কেড়েছে, তারাও আজ জীবন যুদ্ধে পরাজয়ের সম্মুখীন। কেউ রাঁধুনীর কাজ বা অন্য কিছু করে কোনরকমে জীবিকা নির্বাহ করছে, কেউ কেউ ভিক্ষাবৃত্তিও বেছে নিয়েছে।

আশির দশকে পুরাতন গোয়ালন্দে ছিল এই পতিতাপল্লীটি। সেখান থেকে আগুন দিয়ে ঘর-বাড়ী পুড়িয়ে উচ্ছেদ করে দিলে তারা চলে আসে দৌলতদিয়া ঘাটে। পদ্মা নদীর কোল ঘেষে দৌলতদিয়া রেল স্টেশনের পাশে গড়ে ওঠে বর্তমানের এই পতিতাপল্লী।

এখানেও কয়েকবার তাদের ঘর-বাড়ী আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হলেও উচ্ছেদ করা যায়নি। এখন সেখানে অনেকে গড়ে তুলেছে পাকা ঘর, কেউ কেউ আবার বহুতল ভবনও করেছে। যে যৌনকর্মীরা একসময় মারা গেলে কলসীতে রশি বেঁধে লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হতো অথবা পদ্মা নদীর চরে মাটি চাপা দেয়া হতো, আজ তাদের জন্য পতিতাপল্লীর পাশেই করা হয়েছে কবরস্থান।

সেখানেই তাদেরকে ধর্মীয় রীতি মেনে সমাহিত করা হয়। তবে মৃত যৌনকর্মীদের জানাযার নামাজ পড়ানো নিয়ে এখনও ফতোয়ার উপদ্রব চলছে। স্থানীয় ইমাম বা মাওলানারা তাদের জানাযার নামাজে ইমামতি করতে চায় না। তবে তাদের কদর রয়েছে ভোটে অংশগ্রহণকারীদের কাছে। সংসদ নির্বাচনসহ স্থানীয় সরকারের প্রতিটি নির্বাচনে তারা ভোট প্রদান করে।

পতিতাপল্লীর মধ্যেও চলে ভোটের ক্যাম্পিং। যৌনকর্মীরাও পক্ষ নেয় পছন্দের দল বা প্রার্থীর। পরাজিত প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকরা নির্যাতিত হয় বিজয়ী প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের হাতে। এমনকি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়েও অনেক যৌনকর্মীকে মিথ্যা মামলায় জেল খেটে বাড়ী-ঘর ছেড়ে বা বিক্রি করে রাতের অন্ধকারে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে।

তাদের বাড়ী-ঘর প্রভাবশালীদের দখলে চলে গেছে। কেউ কেউ প্রেম-ভালোবাসার ছলনায় পড়ে নিঃস্ব হয়ে জীবন কাটাচ্ছে। কেউ কেউ আবার সুদখোরদের নিকট থেকে টাকা নিয়ে সময়মতো দিতে না পেরে সুদখোরদের কাছে বাড়ী-ঘর ছেড়ে দিয়ে খালি হাতে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। নেশায় ডুবেও অনেকের জীবন প্রদীপ অকালে ঝড়ে গেছে।

এছাড়াও এই পতিতাপল্লীতে রয়েছে রহস্যে ঘেরা অনেক মৃত্যুর ঘটনা, যার কোন কূল-কিনারা হয় না।
সরেজমিনে দৌলতদিয়া পতিতাপল্লী সংলগ্ন পোড়াভিটা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, জীবন-যন্ত্রনা, দুঃখ, বেদনা নিয়ে চলছে বয়সের ভারে অসহায় হয়ে পড়া একসময়ের যৌনকর্মীদের সংসার। তাদের কেউ লঞ্চ ও ফেরী ঘাট থেকে ভিক্ষা করে ফিরছে, কেউ আবার পতিতাপল্লীর মধ্যে রান্না করা খাবার বিক্রির জন্য নিয়ে যাচ্ছে।

কেউবা অন্যের কাপড়-চোপড় ধোয়ার কাজ করছে। অসুস্থরা বিছানায় শুয়ে কান্নাকাটি করছে। এভাবেই জীবন কাটছে তাদের। তারা অন্ধকার গলি থেকে বেরিয়ে এসেছে ঠিকই, কিন্তু যৌবনে টাকা-পয়সার অভাব না বুঝলেও এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। অনেকের ছেলে-মেয়ে থাকলেও খোঁজ-খবর রাখে না। পিতৃ পরিচয় না দিতে পারার কারণে অনেকে গ্রামেও ফিরে যেতে পারে না।

সন্তানহীনদের বেদনা আরো কষ্টের, তাদের মৃত্যুর পর সৎকারটা কে করবে তা নিয়েও তাদের মানসিক যন্ত্রনার শেষ নেই।

সোনিয়া (ছদ্মনাম) কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ছোটবেলায় ভাতের অভাবে বাড়ী থেকে কাজের জন্য শহরে এসেছিলাম। আমার এক আত্মীয় দালালদের মাধ্যমে আমাকে যশোরের এক বাড়ীওয়ালীর নিকট বিক্রি করে দেয়। সেই থেকে আজ পর্যন্ত এই অন্ধকার গলি থেকে বেরিয়ে আসতে পারি নাই। জীবনের কষ্টার্জিত টাকা এক প্রতারকের খপ্পরে পড়ে শেষ হয়ে গেছে। সন্তানের পিতার পরিচয়টুকু নিয়ে সমাজে ফিরে যেতে পারি নাই।

রত্না (ছদ্মনাম) বলেন, চাকরীর প্রলোভনে উত্তরাঞ্চলের এক পতিতাপল্লীতে আসি। অনেক টাকা-পয়সা উপার্জন করলেও তা ধরে রাখতে পারি নাই। মা-বাবা মারা গেছে। ভাইয়েরা খোঁজ-খবর রাখে না। কোন সন্তান না থাকায় অসুস্থ হলে দেখার কেউ নাই। এই বৃদ্ধ বয়সে এসে রাঁধুনীর কাজ করে খাই।

গোয়ালন্দ উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা চন্দন কুমার মিত্র বলেন, যৌনকর্মীদের জন্য কোন বিশেষ বরাদ্দ নেই। তবে বৃদ্ধদের জন্য অল্প কিছু বয়ষ্ক ভাতা চালু করেছি।

যৌনকর্মীদের সংগঠন মুক্তি মহিলা সমিতির নির্বাহী পরিচালক মর্জিনা বেগম বলেন, বৃদ্ধ-অসহায় যৌনকর্মীদের জন্য একটি বৃদ্ধাশ্রম হলে তাদেরকে পুনর্বাসন করা যেত। এছাড়া তরুণ বয়সীদের কারিগরি শিক্ষার মাধ্যেমে হাতের কাজ শিখিয়ে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করলে তাদের অসহায়ত্ব দূর হতো।

আপনার মতামত লিখুন :