মুক্তিযোদ্ধের চেতনা বিকাশে জীবনঢুলী চলচ্চিত্র

তাসনোভা জেরিন উলফাত
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ১১:১০ PM, ১৯ জুলাই ২০২০

জীবনঢুলী হল বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পটভূমিতে নির্মিত একটি চলচ্চিত্র। ১৯৭১ সালে এদেশের সাধারণ মানুষদের ওপর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীরা যে বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে তারই প্রতিফলন ঘটেছে এ চলচ্চিত্র।

এই চলচ্চিত্রটি সরকারি অনুদানে নির্মিত হয়েছে। ১৪ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৪ সালে ছবিটির প্রিমিয়ার শো হয়। তানভীর মোকাম্মেল পরিচালিত এই ছবিতে নিম্নবর্ণের দরিদ্র ঢাকি “জীবনকৃষ্ণ দাস” এর জীবন এবং তার এলাকায় ঘটে যাওয়া নারকীয় হত্যাযজ্ঞ আবির্ভূত হয়েছে।

চলচ্চিত্রে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছে, শতাব্দী ওয়াদুদ, জ্যেতিকা জ্যেতি, ওয়াহীদা মল্লিকা জলি, চিত্রলেখা গুহ, রামেন্দু মজুমদার।

চলচ্চিত্রের প্রেক্ষাপট, খুলনা-যশোর-সাতক্ষীরা জেলার নিকটবর্তী ভদ্রা নদীর কোলঘেঁষে চুকনগরে খুলনা বাগেরহাটসহ নানা জায়গার হাজার হাজার পরিবার ১৯ মে রাত কাটায়। উদ্দেশ্য ছিলো পরদিন সকালে ভারতের উদ্দেশ্যে যাত্রা। কিন্তু পরদিন ২০ মে ঘটে পৃথিবীর ইতিহাসে অল্প সময়ে অধিক সংখ্যক মানুষ হত্যার এক ভয়ঙ্কর হত্যাযজ্ঞ।

বেলা সাড়ে দশটা থেকে চালু হয়ে এই নারকীয় তাণ্ডব, চলে বিকাল অবধি। গুলি, ব্রাশ ফায়ার, বেয়নেটের আঘাতে ও নদীপথে পলায়নরত নর নারী শিশুর সলিল সমাধিতে কতো মানুষের যে মৃত্যু হয় তার সঠিক হিসাব কেউ বলতে পারে না। তবে এই সংখ্যা কোন ক্রমেই দশ হাজারের কম নয়, বরং বেশি বলে মনে করেন প্রত্যক্ষদর্শীরা।

চুকনগর গণহত্যা মূলত একটি সামরিক গণহত্যা যা হানাদার বাহিনী ১৯৭১ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সংঘটিত করে। চুকনগর ভারতের নিকটবর্তী হওয়ায় স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হবার পর বিভিন্ন স্থান থেকে লোকজন সীমান্ত অতিক্রমের জন্য এখানে এসে জড়ো হয়। খুলনা ও বাগেরহাট থেকে ভদ্রা নদী পাড়ি দিয়ে প্রায় ৩০-৪০ হাজার মানুষ চুকনগরে এসে জড়ো হন।

২০ মে বেলা ১১ টার সময় মিলিটারির দুটি দল একটি ট্রাক ও একটি জিপ গাড়িতে এসে চুকনগর বাজারের উত্তরে কাউতলা নামক একটি স্থানে এসে থামে। পাতখোলা বাজার থেকে তারা গুলি চালনা করে এবং পরবর্তীকালে চুকনগর বাজারের দিকে অগ্রসর হতে থাকে।

চলচ্চিত্রের মূলবিষয় বস্তুু, ছবিটির প্রথম দৃশ্যে হিন্দু মুসলমান একসাথে পালা গান শোনার দৃশ্য দেখা যায়, এই চিত্র থেকে প্রতিফলিত হয় যে ১৯৭১ সালে পূর্ব বাংলা ছিলো অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র যেখানে ছিলো ভিন্ন ভিন্ন ধর্মের লোকের বসবাস। গ্রামের সুন্দর মনোরম পরিবেশে হাডু ডু খেলা উপভোগ করছিলো গ্রামবাসী।

ঠিক সেই সময়ে একদল লোক মিছিল দিচ্ছিলো “তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা মেঘনা যমুনা”,”ছয়দফার সংগ্রাম চলছে চলবে”, “তোমার নেতা আমার নেতা শেখ মুজিব শেখ মুজিব”, “জয় বাংলা”। স্লোগান শুনে দুইজন গ্রামবাসী আলোচনা করছিলো জয় বাংলা খাওয়াই দিবানে। এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট হয় সে একদল মানুষ চায়নি বাংলা স্বাধীন হোক। এই বক্তব্যটির পিছনে লুকিয়ে আছে মানবতাবিরোধীদের পাকিস্তান টিকিয়ে রাখার মনোভাব। দূর্গা পূজায় ঢাক বাজায় জীবন।

জীবনকৃষ্ণ দাস ঢাকি নামক প্রধান চরিত্রে অভিনয় করে শতাব্দী ওয়াদুদ। অভিনেতা খুব সুনিপুণ ভাবে তার চরিত্রটি তুলে ধরেছে চলচ্চিত্রে । হিন্দু মুসলমান একসাথে আনুষ্ঠান উপভোগ করে এবং আহার গ্রহন করে । পূজা শেষে জীবন বাড়ী ফেরার সময় দেখে গ্রামে হেলিকাপ্টার ঘুরছে। বাড়িতে এই নিয়ে তার কাকার সাথে আলোচনা করে। উত্তরে জীবনের কাকা জানায় “১৯৪৭ থেকে কতো ঝড় বইছে তাও গ্রাম ছেড়ে যাইনি কিন্তুু এবার মনে হয় যেতে হবে”। পাকিস্তান বাহেনি পরানপুরে প্রবেশ করে। একটি বালক দৌড়াতে দৌড়াতে বলছিলো পাঞ্জাবী আইলোরে। ঠিক সে সময় পাকিস্তান বাহেনী জিপের উপর থেকে গুলি করে হত্যা করে বালকে। আশেপাশের সকল মানুষকে গুলি করে।

গ্রামের বিভিন্ন জায়গায় ব্রাশ ফায়ারিং করে, বাড়ি ঘর আগুনে জ্বালিয়ে দেয়। জীবনের বউ মাছ কাটছিলো সেই অবস্থায়ই শুধুমাত্র তার ছেলে মেয়ে নিয়ে পালিয়ে যায় সে। জীবন এর বউয়ের চরিত্রটিকে ফুটি তুলেছে জ্যেতিকা জ্যেতি। পাকিস্তান বাহেনী গ্রামের যুবকদের লাইনে দাড় করিয়ে গোপনাঙ্গ দেখে বলে শালে মালাউন।

পরবর্তীতে তাদের গুলি করে হত্যা করে পাকিস্তান বাহেনী। পরানপুর যুবক সংঘ নামে প্রতিষ্ঠানটির আগুন নিভানোর চেষ্টা করে গফুর নামে এক পাগল। জীবন ও তার পরিবার বাড়ি ফিরে। ঘরে খাবার নেই জীবন বাজারের দিকে ছুটে। রাস্তায় তিনজন মাস্টারমশাইয়ের সাথে দেখা হয়। তারা বলে জীবন সাবধানে থাকিস বেতন তুলতে ফকিরহাট যাচ্ছি। জীবন বাজার থেকে ফিরার সময় দেখে রাস্তায় তিনজন মাস্টারের লাশে।

সে আরোও লক্ষ করে গ্রামে কিছু মানুষকে মিলেটারী ট্রেনিং দেয়া হচ্ছে। জীবন বাড়িতে ফিরে ভারতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সঞ্চয়ের টাকা মুচির কাছে গিয়ে জুতার ভিতরে সেলাই করে নেয় জীবন। ঘরের থালা বাসন, গরু ছাগল সব বিক্রয় করে তারা ভারতের উদ্দেশ্য যাত্রা করে। তার কাকী একা রয়ে যায় বাড়িতে। জীবন তাকে যাওয়ার জন্য বললে তিনি উত্তর দেন “আমার তুলসি তলায় পানি দিবে কে? আমার নারিকেল গাছগুলো দেখবে কে”?চলচ্চিত্রে তৎকালীন সময়ের রক্ষণশীল সমাজের দৃশ্য বিদ্যমান। আর এই জীবনের কাকী চরিত্রে অভিনেত্রী ওয়াহীদা মল্লিকা জলি আরো সুন্দর ভাবে তা উপস্থাপন করেছেন।

দলে দলে মানুষ ছুটছে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে । হাজার হাজার শরনার্থী কাধে ব্যাগ, মাথায় পুটলি নিয়ে মাইলের পরে মাইল অতিক্রম করছে। জীবন ও তার পরিবার ও দলের সাথে যোগ দেয়। রাস্তায় দেখা যায় এক চিকিৎসক পথযাত্রীদের সেবা প্রদান করছে। ঘাট থেকে পথযাত্রীরা নৌকায় যাত্রা করে অজানা ঠিকানায়। মাঝ নদীতে নৌকায় রাজাকারা হামলা করে যাত্রীদের সবকিছু কেড়ে নিয়ে যায়। ধরে নিয়ে যায় যুবতী মেয়েদেরও। নৌকা থেকে নেমে খোলা মাঠে হাজার হাজার মানুষ আশ্রয় নেয়। মহিলারা রান্না করছে পুরুষরা যোগান দিচ্ছে লাকড়ির।

ঠিক সেই সময় পাকিস্তানীরা হামলা করে। সবাই এদিক সেদিক ছুটছে। মুহূর্তের মধ্যে মাঠ ছেয়ে যায় লাশে। নারী পুরুষ আলাদা করে সবাইকে লাইনে দাড় করিয়ে গুলি করে পাকিস্তানিরা। রক্ষা পায়নি জীবনের স্ত্রী, শিশু ও বৃদ্ধ কাকা। ভাগ্যক্রমে জীবন বেচে যায়। জীবন এক মুসলিম পরিবারের কাছে আশ্রয় চায়। প্রথমে আসম্মতি প্রকাশের পরেও জীবনকৃষ্ণ দাসকে আশ্রয় দেয় মুসলিম পরিবার।

সেই পরিবারে স্ত্রী সেবা দিয়ে জীবনকে সুস্থ করে তোলে এই চরিত্রে আভিনয় করে চিত্রলেখা গুহ। পরের দিন নিজ গ্রাম পরানপুরের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। রাস্তায় সে দেখে একদম মানুষ ডোবা থেকে পচা লাশ টেনে এমে তাদের দেহের স্বর্ন অলংকার লুঠ করছে। বাড়ি ফিরে কাকীকে জানায় তার স্বামী মারা গিয়েছে। জীবনের কাকী সাদা কাপড় পরে, মাথার চুল কেটে ফেলে। পুকুরের কিনারে চারা রোপন করে। জীবনকে গ্রামের কিছু লোক খবর দেয় ট্রেনিং জমছে না গানের দরকার।

কাল সকালে চলে আসিস কিছু কাফিরকে মুসলিম বানাতে হবে। সারিবদ্ধ ভাবে হিন্দুদের ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। কেড়ে নেয়া হয় আসহায় মানুষদের গরু,ছাগল, হাস, মুরগি। জীবন লাইনের পিছনে ঢোল বাজায়। পরবর্তীতে জীবনকে বলা হয় ঢোল নয় ড্রাম বাজাতে হবে তাকে। চলচ্চিত্রে আরো দেখা যায় এক অসহায় মায়ের কান্না। প্রতি রাতে তার মেয়েকে ধর্ষন করে ভোর অবদি রাজাকার ও পাকিস্তানিরা। রাজাকারেরা নৌকা থেকে পালিয়ে যাওয়া এক পরিবারকে থামায় এবং পরিবারের যুবতী মেয়েদের রেখে দেয়। প্রতিবাদ করায় জীবনের সাথীকে গুলি করে রাজাকার।

মেয়েকে ক্যাম্পে আটকে রেখে চালায় পাশবিক নির্যাতন। নির্যাতিত নারী সাহায্যের জন্য জীবনের দিকে তাকিয়ে থাকে। মুক্তিবাহিনী ক্যাম্পে আক্রমন চালায় রাজাকার ও পাকিস্তানিরা পালানোর জন্য নিজ ক্যাম্পে আগুন লাগিয়ে দেয়। নির্যাতিত নারী সাহায্যের জন্য চিৎকার করে। জীবন ড্রাম ফেলে ঘরে যায়। তার ঢোল নিয়ে বাজানো শুরু করে। মুক্তিবাহেনী পাকিস্তানের পতাকা নামিয়ে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করে।

পরিশেষে বলা যায় এই চলচ্চিত্রে মুক্তিযুদ্ধকালীন শরনার্থী সমস্যা, নারী নির্যাতন, রাজাকার ও মানবতাবিরোধীদের কর্মকান্ডের বাস্তব প্রতিফল ঘটেছে। এবং এই চলচ্চিত্রে মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও পাকিস্তান বাহেনীর নির্যাতনের নির্মমতা আনুভব করতে পারবে। জাতির পরিচয় চিহ্নিত করনের ইতিহাসকে এক প্রাণবন্তর রেখায় অঙ্কিত করেছে এই চলচ্চিত্র।

তাসনোভা জেরিন উলফাত
বাংলাদেশ ও মুক্তিযুদ্ধ স্টাডিজ বিভাগ,
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

আপনার মতামত লিখুন :